ঢাকা

শিক্ষাদানের মান নিয়ে প্রশ্ন, ৫৭% স্কুলে পাঠের সঙ্গে মেলে না উপকরণ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
পুরান ঢাকার ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের নবম শ্রেণির পদার্থবিজ্ঞানের ক্লাস। গত ১৯ আগস্ট শিক্ষার্থীদের ‘বিভব শক্তির সংরক্ষণশীলতা’ বোঝাতে শ্রেণিকক্ষে সরল দোলক ব্যবহার করছিলেন সহকারী শিক্ষক আবদুল্লাহ আল নাহিয়ান। দোলকের দোলন দেখিয়ে তিনি বোঝাচ্ছিলেন শক্তির রূপান্তর ও সংরক্ষণশীলতার বিষয়টি।

শিক্ষার্থীরাও বিষয়টি সহজেই বুঝতে পারছিল। শিক্ষক আবদুল্লাহ আল নাহিয়ানের মতে, পাঠের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উপযুক্ত শিখন উপকরণ ব্যবহার করা হলে কঠিন বিষয়ও শিক্ষার্থীদের কাছে সহজে বোধগম্য হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও অংশগ্রহণও বাড়ে।

তবে দেশের অধিকাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষের চিত্র এমন নয়। অনেক বিদ্যালয়ে শিখন উপকরণ থাকলেও সেগুলো যে পাঠ পড়ানো হচ্ছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে শ্রেণিকক্ষে উপকরণের উপস্থিতি থাকলেও তা শিক্ষার্থীদের শেখার কাজে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) সাম্প্রতিক পরিদর্শন প্রতিবেদনে মাধ্যমিক শিক্ষার এই গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে। গত এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সারা দেশে ৫ হাজার ৪৩১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ২ হাজার ৭৪৭টি বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রম সরাসরি মনিটরিং করা হয়েছে।

পরিদর্শন করা বিদ্যালয়গুলোর প্রায় ৫৭ শতাংশে ব্যবহৃত শিখন উপকরণ পাঠ্য বিষয়বস্তুর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। অর্থাৎ শ্রেণিকক্ষে উপকরণ ব্যবহার করা হলেও তার সঙ্গে পাঠের বিষয়বস্তুর প্রয়োজনীয় সামঞ্জস্য নেই।

শুধু শিখন উপকরণ ব্যবহারের ক্ষেত্রেই দুর্বলতা নেই। শিক্ষার্থীরা কী শিখছে, কোথায় পিছিয়ে আছে এবং শেখার অগ্রগতি কতটা—তা যাচাইয়ের ব্যবস্থাতেও বড় ঘাটতি রয়েছে। পরিদর্শন করা বিদ্যালয়গুলোর ৫২ শতাংশে ধারাবাহিক মূল্যায়নের রেকর্ড যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয় না।

মাউশির পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন শাখার প্রতিবেদনে শিখন উপকরণের কার্যকর ব্যবহার এবং ধারাবাহিক মূল্যায়ন—এই দুটি বিষয়কে গুণগত শিখন-শেখানোর প্রক্রিয়ার সবচেয়ে দুর্বল দিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

উপকরণ আছে, কিন্তু পাঠের সঙ্গে মিল নেই

পরিদর্শনের তথ্য বলছে, শ্রেণিকক্ষে প্রয়োজনীয় উপকরণ একেবারেই নেই—চিত্রটি পুরোপুরি এমন নয়। বরং পরিদর্শন করা ২ হাজার ৭৪৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ২ হাজার ৯৮টিতে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজনীয় কোনো না কোনো শিখন উপকরণ রয়েছে।

সমস্যাটি মূলত উপকরণের উপস্থিতি নয়, বরং সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার নিয়ে। শিক্ষক যে বিষয়টি পড়াচ্ছেন, তার সঙ্গে ব্যবহৃত উপকরণ কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—সেখানেই বড় ঘাটতি দেখা গেছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১ হাজার ৫৫৭টি বিদ্যালয়ে ব্যবহৃত শিখন উপকরণ পাঠের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। বিপরীতে ১ হাজার ১৯০টি বিদ্যালয়ে ব্যবহৃত উপকরণ পাঠের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ পাওয়া গেছে।

অসংগতিপূর্ণ শিখন উপকরণ ব্যবহারের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি বিদ্যালয় ঢাকা অঞ্চলে। এ অঞ্চলে এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩২১টি। এরপর ময়মনসিংহে ২৪৯টি, খুলনায় ১৯৪টি, রংপুরে ১৯৩টি, বরিশালে ১৫৩টি, চট্টগ্রামে ১৩৫টি, রাজশাহীতে ১৩২টি, কুমিল্লায় ১১১টি এবং সিলেট অঞ্চলে ৬৯টি বিদ্যালয়ে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

অর্থাৎ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিদ্যালয়েই একই ধরনের সমস্যা রয়েছে। এটি কোনো নির্দিষ্ট এলাকার বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; বরং মাধ্যমিক পর্যায়ের শ্রেণিকক্ষে শিখন উপকরণ ব্যবহারের সামগ্রিক দুর্বলতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, শিক্ষকেরা যেন পাঠদানের সময় সঠিক ও সংগতিপূর্ণ শিখন উপকরণ ব্যবহার করেন, সে বিষয়ে বিদ্যালয়গুলোকে সতর্ক করার পাশাপাশি মনিটরিং জোরদার করা হচ্ছে।

একটি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের চিত্র

মাউশির প্রতিবেদনে একটি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের চিত্রও আলাদাভাবে তুলে ধরা হয়েছে। খুলনা অঞ্চলের ঝিনাইদহের শৈলকুপার একটি বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণির কৃষিশিক্ষা বিষয়ের ক্লাস মনিটরিংয়ের সময় দেখা যায়, ব্যবহৃত শিখন উপকরণ পাঠের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

শুধু তা-ই নয়, শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণও ওই বিদ্যালয়ে ছিল না। স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত বিনা মূল্যের বা পরিত্যক্ত উপকরণ ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের শেখানোর সুযোগও দৃশ্যমান ছিল না।

এ ধরনের চিত্র থেকে বোঝা যায়, অনেক বিদ্যালয়ে শিখন উপকরণ ব্যবহারের ধারণাটি এখনো কার্যকর শ্রেণিকক্ষ পদ্ধতির অংশ হয়ে উঠতে পারেনি। কোথাও উপকরণ নেই, আবার কোথাও উপকরণ থাকলেও তা নির্দিষ্ট পাঠের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা হচ্ছে না।

উপকরণ থাকলেই শেখা নিশ্চিত নয়

শ্রেণিকক্ষে উপযুক্ত শিখন উপকরণ ব্যবহার করলে পাঠ শুধু মুখস্থনির্ভর থাকে না। শিক্ষার্থীরা বিষয়টি দেখে, হাতে-কলমে বা বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বুঝতে পারে। এতে শেখা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও আগ্রহ বাড়ে। তারা প্রশ্ন করার এবং শ্রেণিকক্ষে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়।

তবে কোনো শ্রেণিকক্ষে উপকরণ থাকা এবং সেই উপকরণ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা এক বিষয় নয়। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) বিষয়ভিত্তিক নির্দেশনায়ও শ্রেণিকক্ষে উপযুক্ত শিখন উপকরণ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু মাউশির পরিদর্শনের তথ্য বলছে, নির্দেশনার সঙ্গে বাস্তব শ্রেণিকক্ষের চিত্রের বড় ধরনের ফারাক রয়েছে।

পরিদর্শন করা বিদ্যালয়গুলোর প্রায় ৫৭ শতাংশে পাঠের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন উপকরণ ব্যবহারের তথ্য তাই শুধু উপকরণের সমস্যা নয়; এটি শিক্ষক প্রস্তুতি, পাঠ পরিকল্পনা এবং শ্রেণিকক্ষে শেখানোর কৌশলের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, শিখন কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের তৈরি বিভিন্ন উপকরণ প্রায় অর্ধেক প্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষ বা বিদ্যালয়ে সংরক্ষিত কিংবা দৃশ্যমান রয়েছে। বাকি প্রায় অর্ধেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের তৈরি এসব উপকরণ নেই।

শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের দিয়ে উপকরণ তৈরি করানো এবং সেগুলো শ্রেণিকক্ষে ব্যবহার করা হলে শেখার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা বাড়ে। কিন্তু এ জন্য শিক্ষককে আগে থেকেই পাঠ পরিকল্পনা করতে হয় এবং কোন পাঠে কী ধরনের উপকরণ প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করতে হয়।

প্রশিক্ষণের ঘাটতিও বড় কারণ

শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শিখন উপকরণের কার্যকর ব্যবহার সরাসরি শিক্ষকের দক্ষতা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ঘাটতি যেমন রয়েছে, তেমনি প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে সেই জ্ঞান ও কৌশল প্রয়োগ করছেন কি না, তার নিয়মিত অনুসরণও সব ক্ষেত্রে হয় না।

ফলে অনেক শিক্ষক প্রচলিত পদ্ধতিতে বা দায়সারাভাবে পাঠদান করেন। এতে বইয়ের বিষয়বস্তু শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরা হলেও তা বাস্তব অভিজ্ঞতা, উদাহরণ কিংবা উপযুক্ত উপকরণের সঙ্গে যুক্ত করা হয় না।

এর ফল পড়ে শিক্ষার্থীদের শিখনফলে। কোনো বিষয় বুঝতে না পারলেও শিক্ষার্থীর দুর্বলতা তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। পরবর্তী শ্রেণিতে উঠতে উঠতে সেই ঘাটতি আরও বাড়তে থাকে।

শিক্ষকসংকটে বাড়ছে চাপ

শিক্ষকের প্রশিক্ষণের ঘাটতির পাশাপাশি শিক্ষকসংকটও শ্রেণিকক্ষে কার্যকর শেখানোর পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকলে একজন শিক্ষককে একাধিক শ্রেণিতে পাঠদান করতে হয়। পাশাপাশি তাঁকে অতিরিক্ত প্রশাসনিক বা অন্য দায়িত্বও পালন করতে হয়।

ফলে পাঠ প্রস্তুতি নেওয়া, শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা এবং নির্দিষ্ট পাঠের উপযোগী শিখন উপকরণ নির্বাচন ও ব্যবহারের জন্য শিক্ষকের হাতে পর্যাপ্ত সময় থাকে না।

বিশেষ করে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকসংকট প্রকট। মাউশির তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৭০২টি। এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ১৫ হাজার ২৯৩টি। এর মধ্যে তিন হাজারের বেশি পদ শূন্য রয়েছে। প্রধান শিক্ষকের ৩৮৩টি পদও খালি।

এর সঙ্গে রয়েছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) শিক্ষকের সংকট। আইসিটি বাধ্যতামূলক হওয়ার ১৩ বছর পরও সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে এ বিষয়ের জন্য আলাদা শিক্ষক পদ সৃষ্টি হয়নি। ফলে গণিত, ব্যবসায় শিক্ষা ও বিজ্ঞানের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে অথবা অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে আইসিটি পড়াতে হচ্ছে।

ঢাকার একটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তিনি আইসিটির শিক্ষক নন। তারপরও তাঁকে এ বিষয়ের ক্লাস নিতে হয়। সম্প্রতি একদিন আইসিটির ক্লাস নেওয়ার সময় ইংরেজি বিষয়ের একজন শিক্ষক অনুপস্থিত থাকায় একই সময়ে তাঁকে ইংরেজির ক্লাসও সামলাতে হয়েছে।

ওই শিক্ষক বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে শিক্ষকের ওপর অতিরিক্ত ক্লাসের চাপ তৈরি হয়। ক্লাস পরিচালনা করাই যখন কঠিন হয়ে পড়ে, তখন নির্দিষ্ট পাঠের উপযোগী শিখন উপকরণ নির্বাচন ও তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করার দিকে যথেষ্ট মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না।

পাঠ পরিকল্পনায়ও ঘাটতি

শ্রেণিকক্ষে উপকরণের যথাযথ ব্যবহার না হওয়ার পাশাপাশি পাঠ পরিকল্পনা ও শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নেও দুর্বলতা রয়েছে।

মাউশির প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দুই হাজারের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠ পরিকল্পনা অনুযায়ী শিখন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তবে প্রায় ২৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে তা হয় না।

শিক্ষার্থীদের শেখানোর আগে পাঠের উদ্দেশ্য, প্রত্যাশিত শিখনফল, প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং মূল্যায়নের পদ্ধতি নির্ধারণ করা না হলে শ্রেণিকক্ষে শেখানোর কার্যক্রম অনেক সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে শিক্ষক কী শেখাবেন, কীভাবে শেখাবেন এবং শিক্ষার্থী আদৌ বিষয়টি বুঝেছে কি না—এই তিনটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকে না।

এ কারণে শিখন উপকরণ ব্যবহারের দুর্বলতাকে শুধু একটি উপকরণ-সংক্রান্ত সমস্যা হিসেবে দেখছেন না শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, এর সঙ্গে শিক্ষকসংকট, প্রশিক্ষণ, পাঠ পরিকল্পনা ও পরিবীক্ষণ—সবকিছুই সম্পর্কিত।

মূল্যায়নের রেকর্ডও যথাযথ নয়

ধারাবাহিক মূল্যায়নের উদ্দেশ্য শুধু শিক্ষার্থীকে নম্বর দেওয়া নয়। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থী কোন বিষয় বুঝেছে, কোথায় দুর্বল এবং কোন জায়গায় তাকে অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন—তা চিহ্নিত করার কথা।

কিন্তু মাউশির পরিদর্শন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৫২ শতাংশ বিদ্যালয়ে ধারাবাহিক মূল্যায়নের রেকর্ড যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয় না।

এর ফলে কোনো শিক্ষার্থী কোনো বিষয়ে পিছিয়ে পড়লে সেটি নিয়মিতভাবে শনাক্ত করে সময়মতো সহায়তা দেওয়ার প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে। একজন শিক্ষার্থী একটি শ্রেণিতে যে ঘাটতি নিয়ে পরের শ্রেণিতে ওঠে, তা ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। একপর্যায়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা কঠিন হয়ে যায়।

শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এর প্রভাব শুধু বিদ্যালয়ের পরীক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ থাকে না। উচ্চশিক্ষায় গিয়ে শিক্ষার্থীর বিষয় বুঝতে সমস্যা হতে পারে। ভবিষ্যতে কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

অন্যদিকে, বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষেই যদি কার্যকরভাবে শেখানো নিশ্চিত করা যায়, তাহলে শিক্ষার্থীদের শেখার বড় একটি অংশ স্কুলেই সম্পন্ন করা সম্ভব। এতে অতিরিক্ত কোচিং বা প্রাইভেট পড়ার ওপর নির্ভরশীলতাও কমানো যেতে পারে।

শিক্ষাক্রম, উপকরণ ও পরিবীক্ষণে সমন্বয়ের প্রয়োজন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান বলেন, শিখনফল অর্জনের ক্ষেত্রে শিখন উপকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে কী উপকরণ ব্যবহার করা হবে, তা নির্ধারণের সময় শিক্ষাক্রম অনুযায়ী কী ধরনের শিখন কার্যক্রম প্রত্যাশিত, সেটি দেখতে হবে।

তাঁর মতে, শিক্ষাক্রমের চাওয়া, শিখন উপকরণের নকশা এবং শ্রেণিকক্ষের পরিবীক্ষণের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত শিখন উপকরণ না থাকলে কিংবা সেগুলো সঠিকভাবে ব্যবহার করা না হলে শিক্ষার্থীদের শিখনফলের ওপর বড় প্রভাব পড়ে।

অধ্যাপক হাফিজুর রহমান মনে করেন, মাউশির পরিদর্শন প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য গুরুত্ব দিয়ে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কোথায় কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে, তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।

শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শুধু বিদ্যালয়ে উপকরণ সরবরাহ করলেই শ্রেণিকক্ষের শেখানোর মান উন্নত হবে না। শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণের বাস্তব প্রয়োগের নিয়মিত তদারকি এবং ধারাবাহিক মূল্যায়নের কার্যকর ব্যবস্থা—সবগুলো একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।

তিন মাসের পরিদর্শনে নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ

মাউশির তিন মাসের পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে বিদ্যালয়ের শিখন-শেখানোর পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।

এ সময়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোট ৭১টি যৌন হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীর একটি উচ্চবিদ্যালয়েই ১২টি অভিযোগ পাওয়া যায়।

মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল জানিয়েছেন, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সংশ্লিষ্ট কমিটির কার্যক্রম জোরদার করা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মনিটরিং আরও জোরদারের উদ্যোগ

মাউশির আওতাধীন মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২০ হাজারের বেশি। তিন মাস অন্তর ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেমের (ডিএমএস) আওতায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এসব বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিদর্শন করে মাউশির পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন শাখা।

গত ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ৫ হাজার ৪৩১টি বিদ্যালয় পরিদর্শনের মাধ্যমে বছরের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক মনিটরিং প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এতে শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রম, শিক্ষার্থীদের বই বাড়িতে নিয়ে পড়ার সুযোগ, শিক্ষক-কর্মচারীদের অননুমোদিত অনুপস্থিতি, যৌন হয়রানির অভিযোগসহ বিভিন্ন বিষয়ের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

মাউশির পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিবেদনে উঠে আসা বিষয়গুলো নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মাউশির মহাপরিচালককে অবহিত করা হয়েছে।

মহাপরিচালকও জানিয়েছেন, পাঠদানের সময় শিক্ষকেরা যাতে সঠিক ও পাঠের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিখন উপকরণ ব্যবহার করেন, সে বিষয়ে বিদ্যালয়গুলোকে সতর্ক করার পাশাপাশি মনিটরিং আরও জোরদার করা হচ্ছে।

মোটের ওপর, মাউশির পরিদর্শন প্রতিবেদনের তথ্য মাধ্যমিক শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে—শ্রেণিকক্ষে উপকরণ থাকা মানেই কার্যকর শেখানো নিশ্চিত হওয়া নয়। উপকরণকে পাঠের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ব্যবহার করা, শিক্ষকের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও দক্ষতা নিশ্চিত করা এবং ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর শেখার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ—এই তিনটি প্রক্রিয়া একসঙ্গে কার্যকর না হলে কাঙ্ক্ষিত শিখনফল অর্জন কঠিন। তাই শ্রেণিকক্ষের এই ঘাটতি দূর করতে অবকাঠামো ও উপকরণ সরবরাহের পাশাপাশি শিক্ষক, শিক্ষাক্রম ও নিয়মিত পরিবীক্ষণের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স